স্কুল জীবনের স্মৃতি, ক্লাসের কোন মেয়েকে পছন্দ করা যেমন অস্বাভাবিক ছিলনা, তাকে নিয়ে ভাবনার কোন সীমা পরিসীমা ছিলনা, রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে বিকেলে তার সাথে চোখাচোখি, সে চোখাচোখিতে যেন অনেক অব্যাক্ত অথচ দুজনরই ভাবনার সমস্ত মনের কথা বাতাসকে মাধ্যম করে একে অপরের কাছে পৌছে যেত, বাবা মার চোখ ফাঁকি দিয়ে একটু তার সাথে দেখা করা যেন জীবনের অনেক কিছু পেয়ে যাওয়া, অনন্ত অপরিসীম উপলব্ধি। ভালবাসা শব্দটির ব্যাপক অর্থ না জানা স্বত্তেও শব্দটিই ছিল সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয়।

তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি মাত্র তার উপর বাবার বদলী, দুয়ে মিলে আমাকে ঢাকায় আসতেই হবে। আমার প্রিয় মানুষটি তখনও ওখানে থাকত তাকে ফেলে রেখে আসা ছাড়া কোন গত্যন্তর নাই। তাকে ফেলে রেখে আসলেও ফেলে রেখে এসেছিলাম নিজের ভিতরের সদ্য মর্ম বোঝা একটি হৃদয়কে। যেদিন চলে আসব তার আগেরদিন ক্লাসের বন্ধুরা কলেজের একটি ক্লাসে দুজনকে একান্ত সময় করে দিয়েছিল। মহূর্তটা এমন ও আমার সামনে বসা। অনেক সময় দুজনের চোখেচোখে তাকিয়ে থাকা। প্রার্থনা এ সময় যদি কখনও শেষ না হত। নীরব, নিস্তব্ধ যেন পৃথিবীর সমস্ত নীরবতা আমাদের জন্যই। ওর হাতদুটো এই প্রখম ধরলাম, ধরতেই ওর সমস্ত শরীরটা আমার বুকের উপর ছেড়ে দিল, হয়তবা দেখতে চাইছিল ওর জীবনের সমস্ত ভাবনা, ভালবাসা আমি বইতে পারি কিনা। ছলছল চোখদুটো ভিজে গেল। তখনও কোন কথা ছিলনা। আমার প্রতিশ্র“তি ও আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আমাকে, আমার বুকে মাথাটা গুজে দিয়ে যেন পৃথীবির অনন্ত সুখ খুজঁতে চাইল। আমি সে সুখ তখন ওকে দেইনি, সময়ের অপেক্ষায় ওকে আম্বস্ত করেছিলাম। শেষ বাক্য ”আমি অপেক্ষা করতে জানি এবং করব তুমি শুধু অপেক্ষার শ্রদ্ধা দিও”

চলে এলাম, চলে এলেও শুধু দেহটা নিয়ে আসতে পেরেছিলাম, মন, হৃদয় সবকিছু তো ওখানেই পড়ে ছিল। তখন মোবাইলের এত প্রচলন ছিলনা যোগাযোগ যা হত চিঠি আদান প্রদান। দুজনের মনের কথাগুলো কলমের কালিতে সনির্বদ্ধ ছিল আর কাগজ ছিল তার মাধ্যম। এভাবেই চলছিল, এভাবেই নিজের জীবনের সাথে আর এক অস্তিত্বকে সঙ্গী করে আমার বেড়ে ওঠা। আমার অস্তিত্ব জুড়েই যেন পুরোটা তার অধিকারে সেখানে কারও কোন ভাগ নেই, বড় স্বার্থপর মনে হত তাকে এভাবে কেউ পুরোটা দখল করে নিতে নিজের করে নিতে পারে?

বাংলা মাসে তখন বৈশাখ। জীবনের দোলাচালেও বোশেখের ঝড়ো হাওয়া এসে আমার আমিকে ওলটা পালট করে দিল। হাতে তখনও ওর লেখা পত্র, “আমি কি তোমার অপেক্ষার শ্রদ্ধা দিতে পারব না ? বাবা জোর করে আমাকে ......................... আমি মুছে যেতে পারি কিন্তু তোমাকে কিছুতেই মোছা সম্ভবনা” ওর শেষের কথাগুলো আরও মর্মস্পর্শী ছিল যা অন্যকিছু ইঙ্গিত করছিল। প্রতিউত্তর ছিল ”এমন কিছু করনা যার জন্য আমাকে সারা জীবন অনুশোচনায় থাকতে হয়, একটি পরিবারের নিকট আমাকে অভিশপ্ত করনা” ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, বাসর রাতও হয়েছিল, আর কিছু বলেনি আমাকে বাসর রাত কেমন হল, তারপর তারপরের আরো অনেক না বলা কথা, আর কখনও শোনা হয়নি।

আজ বড় হয়েছি, নিজেকে বোঝার আরও শক্তি, ক্ষমতা সঞ্চারিত হয়েছে নিজের ভিতর। অনেকদিন পর আমি ওদের বাসায় দরজায়। পরিচয় দিতেই ওর বড় বোন চিনতে পারে। শুধু জানতে পারি ও আর এখানে থাকেনা বিয়ের তিন মাসের মাথায় ওর বর ওকে নিয়ে চলে যায় তারপর থেকে ওর কোন খোঁজ নেই। বরের পরিবারেরও কোন খোজ পায়নি ওরা। ওর বাবা আমার সামনে দাড়িয়ে, আমি বের হয়ে এলাম।

= মাথা নিচু করে কিছু বলার আগেই আমিই উত্তর দিলাম। যে সময় ও চলে যায় তখন ওকে আটকানোর মত কোন সাহস ছিলনা, পারতাম ওকে নিয়ে দূরে চলে যেতে কিন্তু ফলাফল ও কষ্ট ছাড়া কিছুই পেতনা, অপরিপূর্ণতার মধ্য দিয়ে ওর সুখের প্রত্যাশায় নিজেকে ওর কাছ থেকে দূরে রেখেছিলাম আজ যখন ওকে হারানোর কষ্ট আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তখন ওর হারিয়ে যাওয়া আমাকে এ জগৎ সংসারের নরকে ঠেলে দিয়েছে।
আমি আজও ওকে খুঁজে ফিরি, আমার ভিতর বাহিরে সবখানে, আমার এ পথ চলা যেন শেষ না হয়।



প্রথম প্রকাশ somewhereinblog.net
২২ মে ২০০৭, দুপুর ১:২২

প্রথম প্রকাশ somewhereinblog.net
২২ মে ২০০৭, দুপুর ১:২৪